Pages

Saturday, March 29, 2014

আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন: আল্লাহ তায়ালাকে কে সৃষ্টি করেছে? তিনি কিভাবে পয়দা হলেন?

আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় নিরসন: আল্লাহ তায়ালাকে কে সৃষ্টি করেছে? তিনি কিভাবে পয়দা হলেন?


প্রশ্ন: আমি একজন গুনাহ্‌গার মুসলমান। দীর্ঘকাল অনৈসলামিক জীবন যাপন করেছি। কিছুদিন যাবত আমি ইবাদত ও কুরআন পাঠের আগ্রহ অনুভব করছি। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এর সাথে সাথেই আমার মনে নানা রকম সন্দেহ সংশয় জন্ম নিচ্ছে। আমি এগুলোকে চাপা দিতে চেষ্টা করছি। কিন্তু আশংকা হয় যে, এ সব সংশয় দূর করা না হলে এই বার্ধক্যে এসেও আবার আমার ইবাদত পরিত্যক্ত হয়ে যেতে পারে এবং পুনরায় আমি গোমরাহীতে লিপ্ত হয়ে বসতে পারি। যে সংশয়টি বারবার আমার মনে জাগে, তা আমি মুখে উচ্চারণ করতে চাইনে। কিন্তু সেটি শুধু এ জন্য আপনার কাছে পেশ করছি, যেন আপনি আমাকে বুঝিয়ে আশ্বস্ত করতে পারেন। যে প্রশ্নটি থেকে থেকে আমার মনে জাগে, তা এই যে, আল্লাহ তায়ালাকে কে সৃষ্টি করেছে? তিনি কিভাবে পয়দা হলেন? আল্লাহর দোহাই, আপনি আমার এই সংশয় দূর করে দিন, যাতে আমি এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে নিষ্কৃতি পাই।



জবাব: আপনি যে প্রশ্ন ও সংশয়ের কথা স্বীয় চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, এ ধরনের প্রশ্ন মানুষের মনে জাগা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।



আপনি যদি সামান্য একটু  চিন্তাভাবনা করেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে, এ ধরনের সন্দেহ শুধু আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসীদের মনেই জন্মে না, যে কোনো নাস্তিক সংশয়বাদী ও খোদাদ্রোহীতার মনেও এ ধরনের প্রশ্নাবলী জন্ম নিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি দৃশ্যমান বিশ্বজগতের উর্ধে বা বাইরে এর কোনো স্রষ্টার অস্তিত্ব মানে না, অথবা সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ সংশয় বা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, তাকে কয়েকটা প্রশ্ন অত্যন্ত প্রবলভাবে নাড়া দেয় এবং জবাব দেবার দাবি জানায়। যেমন, এই সৃষ্টি জগতের প্রথম উদ্ভব কিভাবে হয়, এর আর্বিভাবের আসল কারণ বা উৎস কি, জীবন, শক্তি, পদার্থ ও বির্বতনের যে অসংখ্য প্রতীক বা বাহন আমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে, সে সবের সূচনা কবে ও কিভাবে হয়েছিল এবং কে করেছিল? এ ধরনের প্রশ্ন কোনো না কোনোভাবে প্রত্যেক মানুষকেই বিব্রত করে থাকে-তা সে বিশ্বাসীই হোক, সংশয়বাদী হোক অথবা নাস্তিক হোক।

এরপর আরো একটু চিন্তাভাবনা করলে এ ব্যাপারেও সহজেই ধারণা লাভ করা যায় যে, বিশ্ব প্রকৃতির আবির্ভাব ও তার স্রষ্টা সংক্রান্ত এ ধরনের যাবতীয় প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব নিছক নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তি, প্রজ্ঞা, চেষ্টা সাধনা ও তত্ত্বানুসন্ধান দ্বারা লাভ করা প্রত্যেক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্ব স্রষ্টার সত্তা ও গুণাবলীর কল্পনা করাটা অবশ্য অনেক উর্ধের ব্যাপার। তথাপি আমরা যদি ক্ষণকালের জন্য মহাবিশ্বের বাইরেও তার চেয়ে উচ্চতর ও ক্ষমতাধর কোনো শক্তি বা সত্তা এর স্রষ্টা হিসেবে বিদ্যমান আছে কিনা সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাই এবং শুধুমাত্র সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব মেনে নিয়েই ভাবতে শুরু করি, তাহলেও স্থান ও কালের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক বাস্তব ও কাল্পনিক বিষয় এমন রয়েছে, যা পুরোপুরিভাবে আমাদের বোধশক্তির নাগালে আসতে অক্ষম। এ সব জিনিসের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি এতো বেশি যে, তা আয়ত্বে আনা তো দূরের কথা, একটা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে তার কল্পনা করতেও আমরা অপারগ। উদাহরণস্বরূপ, কালের আদি অন্ত সম্পর্কে আমরা কি ভাবতে পারি যে, তার সূচনা কিভাবে ও কখন হয়েছে এবং তা কোথায় গিয়ে কিভাবে সমাপ্ত হবে? সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র,এবং অন্তরীক্ষের অন্যান্য বস্তু যে মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে, সে মহাশূন্যের সীমা সরহদ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, এই মহাশূন্যের সীমার ওপারে কোন্‌ জগত বিরাজ করছে, কল্পনার চোখ দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরেও কি তা দেখার সাধ্য কারো আছে? এ ধরনের দু'একটা উদাহরণ দ্বারাই এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমাদের চিন্তাশক্তি ও বোধশক্তির ক্ষমতা খুবই সীমিত। আমাদের চিন্তাশক্তি ও বোধশক্তির স্বাভাবিক পরিধিই এতো সংকীর্ণ ও সংকুচিত যে, একটা নির্দিষ্ট স্তর পেরিয়ে কোনো কিছু কল্পনা করাও তার পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব। মানবীয় বিবেক বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি যখন এতোই অক্ষম ও সীমাবদ্ধ যে, সে সৃষ্টির রহস্যও পুরোপুরিভাবে বুঝতে পারেনা। তখন সে স্রষ্টার আদি অন্ত কিভাবে উপলব্ধি করতে পারবে?

বিশ্বস্রষ্টা সংক্রান্ত সংশয় যদি নিছুক ব্যাকুলতার কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে যা অনিচ্ছা বশতই অন্তরে অনুপ্রবেশ করে থাকে, তবে তা থেকে কোনো ঈমানদার মুক্ত থাকতে পারে না। বরঞ্চ রসূল সা. একে ঈমানের সুস্পষ্ট আলামত বলে আখ্যায়িত করেছেন। চোর দস্যু সেই গৃহেই হানা দেয়, যেখানে ধনসম্পদ বিদ্যমান। কাজেই ঈমানের সম্পদে সমৃদ্ধ যে হৃদয়, তাকে এ ধরনের আক্রমনের শিকার হতেই হবে। তাই এ ধরণের চিন্তাভাবনা যদি অন্তরে শুধু আসা যাওয়া করে তবে সেটা তেমন উদ্বেগজনক ব্যাপার নয়। ব্যাপারটা উদ্বেগজনক ও শাস্তিযোগ্য হবে তখনই, যখন মুমিন এসব কুপ্ররোচনাকে গুরুত্ব দেবে এবং একে অন্তরে প্রশ্রয় দিয়ে বদ্ধমূল করে লালন করবে ও ফলবান হবার সুযোগ দেবে। অথবা সচেতনভাবে এ প্রশ্নগুলোকে সমাধানযোগ্য মনে করে এর জবাব লাভের ব্যর্থ চেষ্টায় নিয়োজিত হবে এবং তার চর্চা ও প্রচারে আত্মনিয়োগ করবে। শেষোক্ত কর্মপন্থা একজন মুসলমানের পক্ষে মোটেই সঙ্গত নয়। ইসলাম আমাদেরকে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছে, সেটা মনে বদ্ধমূল রাখলে আমরা এ কর্মপন্থা কখনো অবলম্বন করতে পারিনা। কুরআন ও হাদিসে আল্লাহর যে গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করলে বুঝা যায় যে, আল্লাহর গুণাবলীকে অনুরূপ মানবীয় গুণাবলীর সাথে তুলনা করা সম্ভব নয়। উভয়ের মাঝে প্রকৃতপক্ষে কোনো সাদৃশ্যও নেই। এ জন্যই কুরআনে বলা হয়েছে যে, ----------------------- 'তাঁর সমতুল্য কিছুই নেই।' মানবীয় গুণাবলী সীমাবদ্ধ এবং বহিরাগত ও বস্তুগত সহায়ের মুখাপেক্ষী। আবার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তা বাধাবন্ধনহীন ও বহিরাগত সহায়ের ধার ধারেনা। দৃষ্টিশক্তি আমাদেরও আছে। তবে তা একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। তাছাড়া আমাদের দৃষ্টিশক্তির এসব সীমা ও বাধার ঊর্ধে। আমরাও শ্রবণ করি। কিন্তু আমাদের শ্রবণের জন্য কান ও বাতাসের সহায়তা প্রয়োজন। অথচ আল্লাহর শ্রবণের জন্য এসব মাধ্যমের কোনো প্রয়োজন নেই। জীবন ও অস্তিত্ব আমাদেরও আছে, তবে তা বহিরাগত সহায়ক শক্তি ও বস্তুর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আল্লাহর জীবন ও অস্তিত্ব সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। তিনি এমন চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী সত্তা, যিনি আপন শক্তিতেই বহাল আছেন এবং সব কিছুতেই বহাল রেখেছেন। এভাবে চিন্তা গবেষণা চালালে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে উঠবে যে, আল্লাহর অস্তিত্ব সঠিক ও প্রকৃত অর্থেই অনাদি ও অনন্ত। চিরস্থায়ী জীবন ও নিরবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব তাঁর অমর, অক্ষয় ও অবিনশ্বর সত্তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তাঁর জন্ম ও আবির্ভাবের প্রশ্ন তোলা দুটো পরস্পর বিরোধী জিনিসের একত্র সমাবেশ ঘটানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। যিনি নিজের অস্তিত্ব লাভের জন্য আরেক স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হন, তিনি আবার কেমন স্রষ্টা?

এই দিব্য সত্যকে আল্লাহ তায়ালা এভাবে ব্যক্ত করেছেন :
--------------------------------------------------------
কুরআনের এ উক্তির অত্যন্ত চমকপ্রদ ও মনোজ্ঞ ব্যাখ্যা রসূল সা. এভাবে করেছেন :
------------------------------------------------------------------------
"তিনি প্রথম। তাঁর পূর্বে কিছু নেই, তিনি শেষ তাঁর পরে কিছু নেই। তিনিই প্রকাশ্য। তাঁর ঊর্ধ্বে কিছু নেই। তিনিই গোপন, তাঁর কাছে গোপনীয় কিছু নেই।"

সর্বশেষে, অন্তরে অনুপ্রবেশকারী কু-প্ররোচনা সম্পর্কে রসূল সা.-এর কয়েকটি হাদিস উদ্ধৃত করেছি। আল্লাহ চাহে তো এতে আপনার সকল দুশ্চিন্তা ও সংশয়য়ের অবসান ঘটবে :
--------------------------------------------------------------------------- 
"আবু হুরায়রা রা, থেকে বর্ণিত যে রসূল সা. বলেছেন : আল্লাহ আমার উম্মতের মনের যাবতীয় কুচিন্তা ও সন্দেহ সংশয়কে মাফ করে দিয়েছেন, যদি না সে তা কার্যে পরিণত করে কিংবা কারো সাথে আলোচনা করে।"
--------------------------------------------------------------------------
"ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত : এক ব্যক্তি রসূর সা.- এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলো আমার মনে মাঝে মাঝে এমন সব কুচিন্তা আসে, যা মুখে প্রকাশ করার চেয়ে আমি পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া অধিকতর পছন্দ করি। রসূর সা. বললেন : আল্লাহর শোকর যে, তিনি এ ব্যাপারটিকে কেবল কুচিন্তার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।"
-------------------------------------------------------------------------
"আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে, রসূল সা. বলেছেন : মানুষ নানা রকমের প্রশ্নোত্তর করতে থাকবে। এমনকি এক সময় এ প্রশ্নও তোলা হবে যে, আল্লাহ তো এই গোটা জগতের সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যে ব্যক্তির সামনে এ জাতীয় কথাবার্তা উচ্চারিত হবে সে যেনো বলে আমি শুধু এটুকুই যথেষ্ট মনে করি যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের উপর ঈমান এনেছি।"

আর একবার রসূল সা. বলেন : এ ধরণের কুচিন্তার উদ্ভবকালে আল্লাহর আশ্রয় চাইবে এবং ওখানেই থেমে থাকবে। যে ব্যক্তি এখানে থামবেনা এবং কল্পনার লাগাম টেনে ধরবেনা, তার গোমরাহীর সীমাহীন প্রান্তরে উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ানো ছাড়া আর কোনো লাভ হবেনা। [তরজমানুল কুরআন, এপ্রিল ১৯৫৪]

২. প্রশ্ন : আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। এখন আমি জীবনের এমন একটা সময় অতিক্রম করছি, যখন মানসপটে যে ছবিই অংকিত হয়, তা হয় আনন্দ ও তৃপ্তির উৎস, নয় মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। এক সময় ধর্মের প্রতি খুবই অনুরাগী ছিলাম। কিন্তু এখন আমার মনে বিশ্বাসের পরিবর্তে নানা রকমের সন্দেহ সংশয় জন্ম নিতে শুরু করেছে। আমি নামাজও পড়ি। তবে তা নিতান্তই প্রথাসিদ্ধ কাজ হিসেবে। আমার মনে যেসব ধ্যান ধারণার উদ্ভব হয়, তা আপনার কাছে তুলে ধরছি।

আল্লাহর অস্তিত্বকে বিজ্ঞানের সূত্রগুলোর আলোকে কিভাবে প্রমাণ করা যায়? এমনটি হওয়া কি সম্ভব নয় যে, আদিম যুগের মানুষ এ ধারণাটা উদ্ভাবন করে নিয়েছিল এবং তার পর এটা পুরুষানুক্রমে আমাদের পর্যন্ত হস্তান্তরিত হয়েছে? সে সময় মানুষ প্রকৃতির নিয়ম ও বিশ্বজগতের বস্তু নিচয়ের রহস্য জানতো না। কিন্তু আজ সে বিশ্বচরাচরের যাবতীয় রহস্য জেনে ফেলেছে এবং স্রষ্টার বিশ্বাসের প্রয়োজন কি, তা অনেকের বুঝে আসেনা। আল্লাহর অস্তিত্ব মেনে নিলেও কিছু কিছু তত্ত্ব বুদ্ধির অগম্য মনে হয়। রসূল সা.-এর মিরাজ শারীরিকভাবে হয়েছিল এ কথাই এ যাবত শুনে এসেছি। কিন্তু প্রাকৃতিক জগতে মাধ্যাকর্ষণ ও মহাশূন্য সংক্রান্ত অন্য যেসব নিয়ম চালু রয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে এ ঘটনা বুঝে আসেনা। অন্যান্য মোযেজা বা অলৌকিক ঘটনার ক্ষেত্রেও একই জটিলতা দেখা দেয় যে, প্রাকৃতিক নিয়ম লংঘন না করে ঐ ঘটনাগুলো ঘটতে পারেনা। অথচ আল্লাহ তাঁর নিয়ম-কানুনে পরিবর্তন ঘটান না। চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হলে কি পৃথিবী ধ্বংস না হয়ে পারে?

জবাব : আপনার মনে যে প্রশ্নগুলোর উদ্ভব হচ্ছে, তা কোনো তাজ্জবের ব্যাপার নয়। যে কোনো চিন্তশীল মানুষের মনে এ ধরণের প্রশ্ন জাগতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করা কোনো মানুষেরই উচিৎ নয়, যাতে তার লাগামহীন প্রবৃত্তির বাসনা চরিতার্থ হয় এবং যা তাকে জড় পদার্থ, গাছপালা কিংবা পশুপাখির মতো নৈতিক চেতনাহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বানিয়ে দেয়। এ ধরণের উত্তর অনুসন্ধান থেকে নিবৃত্ত থাকাতেই তার কল্যাণ ও মুক্তি নিহিত। পৃথিবীতে যারা আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে তাদের অধিকাংশেরই অস্বীকৃতির একমাত্র কারণ এই যে, আল্লাহকে মেনে নিলে তাদেরকে কতিপয় বিধিনিষেধের অধীন জীবনযাপন করতে হয়। তা না হলে আপনি ভেবে দেখুন তো, একজন বিজ্ঞানীর কাছে আল্লাহকে অস্বীকার করার পক্ষে কি যুক্তি প্রমাণ থাকতে পারে? বিজ্ঞান তো শুধু পার্থিব জগত নিয়েই আলোচনা গবেষণা করে, যা বস্তু ও শক্তি নিয়েই গঠিত অথচ এই বিজ্ঞানই স্বীকার করে যে, এই বস্তু জগৎ অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান নয়, আপনা আপনিও গঠিত হয়নি এবং তা অনন্তকাল স্থায়ী হতেও সক্ষম নয়, তেমনি কিভাবে নির্জীব পদার্থের জীবনের আবির্ভাব ঘটে এবং কিভাবেই বা তা বিলুপ্ত হয়, সে কথাও বলতে পারে না। মহাবিশ্বের এমন কোনো সীমাপরিসীমা নেই এবং তার সীমানার এমন কোনো প্রথম প্রান্ত ও শেষ প্রান্ত নেই, যা মানুষের নাগালে আসতে পারে। এমতাবস্থায় মহাবিশ্বের এমন একজন সৃষ্টিকর্তা ও নির্মাতার অস্তিত্ব মেনে নেয়া ছাড়া গতান্তর নেই যিনি গোটা বিশ্বের চেয়েও বিরাট ও বিশাল এবং যার অবস্থান বিশ্বজগতের ঊর্ধে ও নেপথ্যে। এছাড়া রহস্যের উন্মেচন আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অন্তত: এটুকু যুক্তির আওতায় এবং এই ব্যাখ্যার আলোকে আল্লাহর অস্তিত্বকে প্রত্যেক উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানীই স্বীকার করে থাকেন এবং কোনো বিজ্ঞানীই আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারেন না।

১. কয়েক বছর আগে আমেরিকায় দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা নামকরা চল্লিশজন বিজ্ঞানীর নিবন্ধন সম্বলিত একখানা বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বিজ্ঞানীদের প্রত্যেকেই আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন এবং তার স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেছেন্ 'খুদা মওজুদ হায়' এই শিরোনামে লাহোরের প্রাংকলিন প্রকাশনী উর্দুতে এবং 'চল্লিশজন সেরা বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে আল্লাহর অস্তিত্ব' এই শিরোনামে ঢাকায় একটি প্রকাশনী বাংলায় পুস্তকটি প্রকাশ করে। এরপর যে প্রশ্ন বাকি থাকে তা হলে, আল্লাহ যদি থেকে থাকেন তবে তিনি কেমন সত্তা ও গুণাবলীর অধিকারি? তাঁর ইচ্ছে ও মর্জি কি এবং মানুষের কাছে তিনি কি চান? এসব প্রশ্নের জবাব কেউ নিজস্ব বুদ্ধি ও যুক্তির উপর নির্ভর করে দিতে পারেন না-তা তিনি বিজ্ঞানীই হোন বা অবিজ্ঞানীই হোন। এর জবাব যে অকাট্য সত্য, সে ব্যাপারে তাঁর নির্মল ও নিষ্কলুষ চরিত্রই সাক্ষী।

২. ধর্ম ও আল্লাহ সংক্রান্ত বিশ্বাস নিছক মানবীয় মস্তিষ্কের আবিষ্কার এ কথা যদিও সঠিক নয়, তবু প্রশ্ন এই যে, একটি ধারণা বিশ্বাস মানবীয় মনমস্তিষ্ক থেকে উদ্ভুত বলেই কি বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকতে পারেনা? মানুষের মস্তিষ্কজাত হওয়াই কি অবাস্তব প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে? এমন কি হতে পারেনা যে, আল্লাহর অস্তিত্ব আসলেই একটা জ্বলন্ত সত্য এবং মানুষের মনে তারই প্রতিবিম্ব রেখাপাত করে? মানুষের মনমস্তিষ্ক যে আবহমানকাল ধরে আল্লাহর অস্তিত্বের ধারণা পোষণ করে আসছে, এর দ্বারা কিভাবে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ নেই? এটা তো বরং আল্লাহর অস্তিত্বেরই একটি প্রমাণ।

এই যু্ক্তিটাও সম্পর্ণ ভ্রান্ত যে, প্রকৃতির নিয়ম আগেকার যুগের মানুষের জানা ছিলনা বলেই তারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। প্রশ্ন এই যে, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক রীতি সংক্রান্ত যাবতীয় গুপ্ত রহস্য ও বিস্তৃত তত্ত্ব তথ্য কি মানুষ ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছে, কিংবা কখনো তা জানতে পারবে? আপনি কি আমাকে এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন যে, অসংখ্য জ্যোতিষ্কপিন্ডে ভরপুর এই মহাবিশ্বের শেষ কোথায় এবং সেই শেষ প্রান্তের ওপারে কি আছে? ধরে নিলাম, সমস্ত প্রাকৃতিক নিয়ম আপনি রপ্ত করে ফেলেছেন। তথাপি আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন এই রহস্যঘেরা নীরব নিঝুম প্রকৃতির এসব নিয়ম রীতি কার তৈরি এবং প্রকৃতির এই সব উপাদানকে ঐ নিয়ম রীতি মেনে চলতে কে বাধ্য ও বশীভূত করে রেখেছে?

৩. মিরাজ শারীরিক না আত্মিকভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে যদিও পূর্বতন মুসলিম মনীষীদের মধ্যে কিছু মতভেদ হয়েছে, তবে আমাদের মতে, সঠিক তথ্য এই যে, এটা একসাথে শরীরিক ও আত্মিক উভয়ভাবেই সংঘটিত হয়েছিল। মিরাজ, চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত এবং এ ধরনের অন্যান্য অলৌকিক ঘটনাবলী সম্পর্কে যাবতীয় প্রশ্ন কেবল তখনই জন্মে যখন মানুষ তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক দিয়ে প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ ও তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। সে মনে করে, এই বিশ্বপ্রকৃতি যেমন কতিপয় আইন কানুনের অধীন, তেমনি এ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাও এসব আইন কানুনের অনুগত ভৃত্য এবং নিজের তৈরি নিয়মবিধির শৃংখলে তিনি নিজেও বাঁধা। অথচ এ ধারণাটা মূলতই ভুল ও বাতিল। আল্লাহ যখন ইচ্ছে নিজের আইন-কানুন ও নিয়ম রীতিতে রদবদল ঘটাতে পারেন এবং সেই রদবদলও তাঁর আইন অনুসারেই হবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রচলিত নিয়ম এই যে, আল্লাহ নর ও নারীর মিলনক্রমে মানুষ সৃষ্টি করে থাকেন। কিন্তু নর ও নারীর এই মিলন মানব সৃষ্টির কোনো চিরন্তন ও অলংঘনীয় বিধান হতে পারেনা। আল্লাহ ইচ্ছে করলে এ ছাড়াও মানুষ সৃষ্টি করে সক্ষম।

অনুরূপভাবে আল্লাহ ইচ্ছে করলে মধ্যাকর্ষণের বিধানকে নিষ্ক্রীয় করে দিতে পারেন এবং স্বীয় বান্দাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন, যেখানে তাঁর জ্যোতি বিচ্ছুরিত ও কেন্দ্রিভূত। আল্লাহ ইচ্ছে করলে কিছুক্ষণের জন্য চাঁদকে দু'টুকরো করে দিতে এবং পৃথিবী ও অন্যান্য জ্যোতিষ্ক পিণ্ডকে তার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারেন। একথা নি:সন্দেহে সত্য যে, আল্লাহর বিধান অটল ও তাঁর সিদ্ধান্ত অকাট্য। তিনি এগুলোর রদবদল করেন না। কিন্তু আল্লাহর বিধান কি এবং তাঁর সিদ্ধান্তগুলোই বা কি, সেটা আমরা কেমন করে জানবো। আল্লাহ যে জিনিসকে নিজের বিধান বলে মনে করেন, তা অবশ্যই অপরিবর্তনীয়। কিন্তু যে জিনিসকে আমরা আল্লাহর বিধান বলে মনে করি, তাতে সব সময়ই পরিবর্তন ঘটা সম্ভব। যেমন এক ব্যক্তি মনে করে যে, সূর্য সব সময় পূর্ব দিক থেকে উঠবে বা উঠতে দেখা যাবে এটাই আল্লাহর বিধান। কিন্তু আল্লাহর বিধান এমনও হতে পারে যে, এক দিন তার গতিবিধি পাল্টে দেয়া হবে কিংবা তার অস্তিত্বই বিলুপ্ত করা হবে। এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, কুরআনে 'মুন্সায়াতুল্লাহ' বা 'আল্লাহর বিধান' কথাটি দ্বারা সর্বোতভাবে প্রাকৃতিক নিয়ম রীতিকে বুঝানো হয়নি, বরং নৈতিক ও চারিত্রিক বিধানকে বুঝানো হয়েছে, যা পৃথিবীর জাতিসমূহের ও মানব সভ্যতার উত্থান পতন অথবা বিবর্তন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত। আর এটাও এমন কোনো ধরাবাধা একক বিধান নয়, বরং অত্যন্ত ব্যাপক ও বিজ্ঞানসম্মত এক নীতিমালা, যা মানব জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগে চালু ও কার্যকর রয়েছে। [তরজামানুল কু্রআন, ডিসেম্বর ১৯৭৪]  রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড

লিখেছেন: সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদূদী           

Source: http://www.islam.net.bd
নাস্তিকের প্রশ্নের জবাব । সাঈদী । Nastiker Proshner Jobab । Sayedee । CHP

No comments:

Post a Comment